শরীরের ভেতরে কি চলছে, তা অনেক সময় বাইরে থেকে বোঝা যায় না। ক্যান্সার এমন একটি রোগ, যা নীরবে শরীরের ক্ষতি করে। তাই ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীর ১০ লক্ষণ সম্পর্কে জানা থাকলে, দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে। ক্যান্সার কোনো একটি নির্দিষ্ট রোগ নয়, এটি রোগের একটি সমষ্টি। শরীরের বিভিন্ন অংশে বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সার হতে পারে, এবং এর লক্ষণগুলোও ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে। তবে কিছু সাধারণ লক্ষণ আছে, যা ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে দেখা যায়। এই লক্ষণগুলো জানা থাকলে আপনি বা আপনার কাছের কেউ যদি ক্যান্সারে আক্রান্ত হন, তাহলে দ্রুত সনাক্ত করে চিকিৎসা শুরু করা সম্ভব।
ক্যান্সারের লক্ষণগুলো অনেক সময় অন্যান্য সাধারণ রোগের মতো মনে হতে পারে, তাই অনেকেই একে গুরুত্ব দেন না। কিন্তু মনে রাখবেন, शुरुआती পর্যায়ে ক্যান্সার সনাক্ত করা গেলে তা নিরাময়ের সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়। তাই কোনো লক্ষণ দেখা গেলে অবহেলা না করে দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ নিন।
ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীর ১০ লক্ষণ
ক্যান্সারের লক্ষণগুলো নির্ভর করে ক্যান্সারের প্রকার এবং শরীরের কোন অংশে এটি আক্রমণ করেছে তার উপর। নিচে ১০টি সাধারণ লক্ষণ আলোচনা করা হলো, যা ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে প্রায়ই দেখা যায়:
১. অস্বাভাবিক ওজন হ্রাস
কোনো কারণ ছাড়াই যদি আপনার ওজন কমতে থাকে, তাহলে এটি একটি উদ্বেগের বিষয়। ডায়েট বা ব্যায়াম না করে যদি অল্প সময়ে ৫ কেজির বেশি ওজন কমে যায়, তাহলে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত। ক্যান্সার কোষগুলো শরীরের শক্তি ব্যবহার করে দ্রুত বৃদ্ধি পায়, যার ফলে ওজন কমে যেতে পারে।
২. ক্লান্তি বা দুর্বলতা
সব সময় ক্লান্তি লাগা বা দুর্বল অনুভব করা ক্যান্সারের একটি সাধারণ লক্ষণ। পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়ার পরও যদি ক্লান্তি না কমে, এবং দৈনন্দিন কাজকর্ম করতে অসুবিধা হয়, তাহলে এটি ক্যান্সারের লক্ষণ হতে পারে। ক্যান্সার শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়, যার ফলে ক্লান্তি লাগে।
৩. ব্যথা
শরীরের কোনো অংশে একটানা ব্যথা হওয়া ক্যান্সারের লক্ষণ হতে পারে। বিশেষ করে হাড়ের ক্যান্সার, মস্তিষ্কের ক্যান্সার বা ডিম্বাশয়ের ক্যান্সারের ক্ষেত্রে ব্যথা একটি প্রধান লক্ষণ। যদি কোনো নির্দিষ্ট স্থানে দীর্ঘদিন ধরে ব্যথা থাকে এবং সাধারণ চিকিৎসায় না কমে, তাহলে ডাক্তারের পরামর্শ নিন।
৪. ত্বকের পরিবর্তন
ত্বকের রঙে পরিবর্তন, যেমন – ত্বক হলুদ হয়ে যাওয়া (জন্ডিস), কালো ছোপ পড়া, বা ত্বকের কোনো অংশে চুলকানি হওয়া ক্যান্সারের লক্ষণ হতে পারে। এছাড়াও, তিলের আকারে বা রঙে পরিবর্তন, অথবা নতুন কোনো তিল দেখা দেওয়াও ত্বকের ক্যান্সারের লক্ষণ হতে পারে।
৫. মলমূত্রের অভ্যাসে পরিবর্তন
মলত্যাগের অভ্যাসে পরিবর্তন, যেমন – কোষ্ঠকাঠিন্য বা ডায়রিয়া, অথবা মলের সাথে রক্ত যাওয়া কোলন ক্যান্সারের লক্ষণ হতে পারে। প্রস্রাবের সাথে রক্ত যাওয়া বা প্রস্রাবের সময় ব্যথা হওয়া মূত্রাশয় বা কিডনি ক্যান্সারের লক্ষণ হতে পারে।
৬. দীর্ঘস্থায়ী কাশি বা স্বর পরিবর্তন
যদি আপনার কাশি তিন সপ্তাহের বেশি সময় ধরে থাকে এবং সাধারণ চিকিৎসায় না কমে, তাহলে এটি ফুসফুসের ক্যান্সারের লক্ষণ হতে পারে। গলার স্বরের পরিবর্তন, যেমন – গলা ভাঙা বা ফ্যাসফ্যাসে হয়ে যাওয়া ল্যারিংস ক্যান্সারের লক্ষণ হতে পারে।
৭. খাবার গিলতে অসুবিধা
খাবার গিলতে অসুবিধা হওয়া বা গলায় আটকে যাওয়া অনুভূতি খাদ্যনালী বা গলার ক্যান্সারের লক্ষণ হতে পারে। অনেক সময় খাবার গিলতে গিয়ে কাশি হতে পারে বা বমি বমি ভাব লাগতে পারে।
৮. স্তনে বা শরীরের অন্য কোনো অংশে চাকা
স্তন বা শরীরের অন্য কোনো অংশে চাকা অনুভব করলে তা ক্যান্সারের লক্ষণ হতে পারে। স্তনে চাকা অনুভব করলে দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত, কারণ এটি স্তন ক্যান্সারের লক্ষণ হতে পারে।
৯. জ্বর
জ্বর সাধারণত ক্যান্সারের প্রাথমিক লক্ষণ নয়, তবে লিউকেমিয়া বা লিম্ফোমার ক্ষেত্রে জ্বর হতে পারে। যদি আপনার শরীরে কোনো সংক্রমণ না থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘদিন ধরে জ্বর থাকে, তাহলে ডাক্তারের পরামর্শ নিন।
১০. রক্তপাত
কাশি বা মলের সঙ্গে রক্ত গেলে অথবা শরীরের অন্য কোনো স্থান থেকে অস্বাভাবিক রক্তপাত হলে তা ক্যান্সারের লক্ষণ হতে পারে। মাসিকের সময় অতিরিক্ত রক্তপাত হওয়াও জরায়ু ক্যান্সারের লক্ষণ হতে পারে।
ক্যান্সার নিয়ে কিছু সাধারণ প্রশ্নের উত্তর (FAQ)
ক্যান্সার নিয়ে মানুষের মনে অনেক প্রশ্ন থাকে। এখানে কিছু সাধারণ প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হলো:
ক্যান্সার কি ছোঁয়াচে?
না, ক্যান্সার ছোঁয়াচে রোগ নয়। ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীর সংস্পর্শে এলে ক্যান্সার হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।
ক্যান্সারের কারণ কি?
ক্যান্সারের নির্দিষ্ট কোনো একটি কারণ নেই। জিনগত ত্রুটি, পরিবেশগত কারণ, খাদ্যাভ্যাস, এবং জীবনযাত্রার ধরনের কারণে ক্যান্সার হতে পারে।
ক্যান্সার কিভাবে নির্ণয় করা হয়?
শারীরিক পরীক্ষা, রক্ত পরীক্ষা, ইমেজিং (যেমন – এক্স-রে, সিটি স্ক্যান, এমআরআই), এবং বায়োপসির মাধ্যমে ক্যান্সার নির্ণয় করা হয়।
ক্যান্সারের চিকিৎসা কি কি?
ক্যান্সারের চিকিৎসা নির্ভর করে ক্যান্সারের প্রকার এবং স্টেজের উপর। সাধারণত সার্জারি, কেমোথেরাপি, রেডিয়েশন থেরাপি, এবং ইমিউনোথেরাপি ব্যবহার করা হয়।
ক্যান্সার প্রতিরোধ করা যায়?
কিছু ক্ষেত্রে ক্যান্সার প্রতিরোধ করা সম্ভব। স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, ধূমপান পরিহার, সঠিক খাদ্যাভ্যাস, এবং নিয়মিত স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে ক্যান্সারের ঝুঁকি কমানো যায়।
ক্যান্সার থেকে বাঁচতে কিছু টিপস
- নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করান।
- ধূমপান ও মদ্যপান পরিহার করুন।
- স্বাস্থ্যকর খাবার খান, যেমন – ফল, সবজি, এবং শস্য।
- নিয়মিত ব্যায়াম করুন।
- পরিবেশ দূষণ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে চলুন।
| লক্ষণ | সম্ভাব্য ক্যান্সার | কখন ডাক্তার দেখাবেন |
|---|---|---|
| ওজন হ্রাস | অগ্ন্যাশয়, পাকস্থলী, খাদ্যনালী, ফুসফুস ক্যান্সার | কোনো কারণ ছাড়াই ওজন কমতে থাকলে |
| ক্লান্তি | লিউকেমিয়া, লিম্ফোমা | পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়ার পরও ক্লান্তি না কমলে |
| ব্যথা | হাড়, মস্তিষ্ক, ডিম্বাশয় ক্যান্সার | কোনো নির্দিষ্ট স্থানে দীর্ঘদিন ধরে ব্যথা থাকলে |
| ত্বকের পরিবর্তন | ত্বকের ক্যান্সার, লিভার ক্যান্সার | ত্বকের রঙে পরিবর্তন, তিলের আকারে পরিবর্তন হলে |
| মলের অভ্যাসে পরিবর্তন | কোলন ক্যান্সার | কোষ্ঠকাঠিন্য বা ডায়রিয়া, মলের সাথে রক্ত গেলে |
| কাশি | ফুসফুস ক্যান্সার | তিন সপ্তাহের বেশি কাশি থাকলে |
| গিলতে অসুবিধা | খাদ্যনালী ক্যান্সার | খাবার গিলতে অসুবিধা হলে |
| স্তনে চাকা | স্তন ক্যান্সার | স্তনে বা শরীরের অন্য কোনো অংশে চাকা অনুভব করলে |
| জ্বর | লিউকেমিয়া, লিম্ফোমা | কোনো সংক্রমণ না থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘদিন ধরে জ্বর থাকলে |
| রক্তপাত | বিভিন্ন ক্যান্সার | কাশি বা মলের সঙ্গে রক্ত গেলে, অস্বাভাবিক রক্তপাত হলে |
মূল বিষয় (Key Takeaways)
- অস্বাভাবিক ওজন হ্রাস, ক্লান্তি, এবং ব্যথা ক্যান্সারের সাধারণ লক্ষণ।
- ত্বকের পরিবর্তন, মলমূত্রের অভ্যাসে পরিবর্তন, এবং দীর্ঘস্থায়ী কাশি ক্যান্সারের ইঙ্গিত দিতে পারে।
- খাবার গিলতে অসুবিধা, স্তনে চাকা, জ্বর, এবং রক্তপাত অবহেলা করা উচিত নয়।
- নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ক্যান্সারের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।
- উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ নিন।
ক্যান্সার একটি মারাত্মক রোগ হলেও, সঠিক সময়ে সনাক্ত করা গেলে এবং চিকিৎসা শুরু করলে সুস্থ জীবনযাপন করা সম্ভব। তাই নিজের শরীরের প্রতি যত্ন নিন, লক্ষণগুলো সম্পর্কে সচেতন থাকুন, এবং প্রয়োজনে ডাক্তারের পরামর্শ নিন। সুস্থ থাকুন, ভালো থাকুন।
