নবজাতকের জন্ডিস হলে মায়ের করনীয়
নবজাতকের জন্ডিস! নামটা শুনলেই মায়ের বুকটা ধক করে ওঠে, তাই না? চিন্তা করবেন না, আপনি একা নন। নবজাতকের জন্ডিস খুবই সাধারণ একটি সমস্যা। তবে হ্যাঁ, এর সঠিক পরিচর্যা জানাটা খুবই জরুরি। আজকের ব্লগ পোস্টে আমরা আলোচনা করব নবজাতকের জন্ডিস হলে একজন মা হিসেবে আপনার করনীয় কী কী।
জন্ডিস কী এবং কেন হয়?
জন্ডিস মানে হল আপনার বাচ্চার রক্তে বিলিরুবিন (Bilirubin) নামক একটি হলুদ পিগমেন্টের মাত্রা বেড়ে যাওয়া। বিলিরুবিন তৈরি হয় যখন স্বাভাবিকভাবে পুরাতন লোহিত রক্তকণিকা ভাঙে। জন্মের আগে, মায়ের শরীর এই বিলিরুবিন সরিয়ে দিত। কিন্তু জন্মের পর বাচ্চার লিভার (Liver) যখন বিলিরুবিন সরানোর জন্য প্রস্তুত হতে একটু সময় নেয়, তখন জন্ডিস দেখা দিতে পারে।
জন্ডিসের প্রকারভেদ
জন্ডিস বিভিন্ন ধরনের হতে পারে, তবে নবজাতকদের মধ্যে প্রধানত যে কয়েকটি দেখা যায় সেগুলো হলো:
- ফিজিওলজিক্যাল জন্ডিস (Physiological Jaundice): এটি সবচেয়ে সাধারণ। জন্মের ২-৩ দিনের মধ্যে দেখা দেয় এবং সাধারণত এক সপ্তাহের মধ্যে সেরে যায়।
- ব্রেস্ট মিল্ক জন্ডিস (Breast Milk Jaundice): কিছু কিছু বাচ্চার ক্ষেত্রে মায়ের বুকের দুধের কারণে জন্ডিস হতে পারে। এটা সাধারণত জন্মের প্রথম সপ্তাহের পরে দেখা যায় এবং কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত থাকতে পারে।
- ব্লাড গ্রুপ ইনকম্প্যাটিবিলিটি (Blood Group Incompatibility): মায়ের রক্তের গ্রুপের সাথে বাচ্চার রক্তের গ্রুপের অমিল থাকলে জন্ডিস হতে পারে। Rh ইনকম্প্যাটিবিলিটি বা ABO ইনকম্প্যাটিবিলিটির কারণে এটা হতে পারে।
নবজাতকের জন্ডিস হলে মায়ের করনীয়
জন্ডিস হলে একজন মা হিসেবে আপনি কী করবেন, তা নিয়ে অনেক চিন্তা হওয়া স্বাভাবিক। এখানে কিছু জরুরি বিষয় আলোচনা করা হলো:
চিকিৎসকের পরামর্শ নিন
প্রথমেই একজন শিশু বিশেষজ্ঞের (Pediatrician) পরামর্শ নিন। তিনিই আপনার বাচ্চার জন্ডিসের মাত্রা এবং ধরণ অনুযায়ী সঠিক চিকিৎসা দিতে পারবেন।
নিয়মিত বুকের দুধ খাওয়ান
জন্ডিসের চিকিৎসায় বুকের দুধের বিকল্প নেই।
- ঘন ঘন খাওয়ান: বাচ্চাকে দিনে অন্তত ৮-১২ বার বুকের দুধ খাওয়ান।
- সঠিক পদ্ধতি: খেয়াল রাখুন বাচ্চা যেন সঠিকভাবে মায়ের স্তন থেকে দুধ টানতে পারে।
বুকের দুধ খাওয়ানো কেন জরুরি? বুকের দুধ খেলে বাচ্চার শরীর থেকে বিলিরুবিন প্রস্রাব এবং মলের মাধ্যমে বের হয়ে যায়।
আলো therapy (Phototherapy)
অনেক সময় ডাক্তাররা আলো therapy দেওয়ার পরামর্শ দেন।
- কীভাবে কাজ করে: বিশেষ ধরনের নীল আলো ব্যবহার করে বিলিরুবিনকে এমন একটি ফর্মে পরিবর্তন করা হয়, যা বাচ্চার শরীর থেকে সহজে বের হয়ে যেতে পারে।
- বাড়িতে যত্ন: যদি বাড়িতে আলো therapy দেওয়ার ব্যবস্থা থাকে, তাহলে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী তা করুন।
পর্যাপ্ত বিশ্রাম
মা হিসেবে আপনার নিজেরও পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া প্রয়োজন।
- শারীরিক ও মানসিক বিশ্রাম: পর্যাপ্ত ঘুম আপনার শরীরের জন্য খুবই জরুরি।
- পুষ্টিকর খাবার: নিজের খাদ্য তালিকায় পুষ্টিকর খাবার রাখুন, যা আপনার এবং আপনার বাচ্চার জন্য উপকারী।
জন্ডিসের লক্ষণ পর্যবেক্ষণ
নিয়মিত বাচ্চার জন্ডিসের লক্ষণগুলো পর্যবেক্ষণ করুন।
- ত্বকের রঙ: বাচ্চার ত্বক এবং চোখের সাদা অংশ হলুদ হয়ে যাচ্ছে কিনা, তা দেখুন।
- ঘুম: বাচ্চা অতিরিক্ত ঘুমাচ্ছে কিনা অথবা নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে কিনা, সেদিকে খেয়াল রাখুন।
- খাবার গ্রহণ: বাচ্চা বুকের দুধ ঠিকমতো খাচ্ছে কিনা, তা লক্ষ্য করুন।

যদি কোনো অস্বাভাবিকতা দেখেন, দ্রুত ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করুন।
জন্ডিস নিয়ে কিছু সাধারণ প্রশ্ন ও উত্তর (FAQ)
জন্ডিস নিয়ে আপনার মনে অনেক প্রশ্ন আসা স্বাভাবিক। এখানে কিছু সাধারণ প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হলো:
নবজাতকের জন্ডিস কতদিন থাকে?
সাধারণত, ফিজিওলজিক্যাল জন্ডিস জন্মের ২-৩ দিনের মধ্যে শুরু হয় এবং এক সপ্তাহের মধ্যে সেরে যায়। ব্রেস্ট মিল্ক জন্ডিস একটু বেশি সময় ধরে থাকতে পারে, প্রায় কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত।
জন্ডিস কি মারাত্মক হতে পারে?
বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই জন্ডিস মারাত্মক নয়। তবে, বিলিরুবিনের মাত্রা খুব বেশি বেড়ে গেলে তা বাচ্চার মস্তিষ্কের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তাই, সময় মতো চিকিৎসা করানো জরুরি।
জন্ডিস হলে কি বাচ্চাকে পানি খাওয়ানো উচিত?
সাধারণত, বুকের দুধ বা ফর্মুলা মিল্কই যথেষ্ট। ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া বাচ্চাকে অন্য কিছু খাওয়ানো উচিত না।
নবজাতকের জন্ডিস হলে ঘরোয়া প্রতিকার কি কিছু আছে?
ঘরোয়া প্রতিকার হিসেবে তেমন কিছু নেই। তবে, বাচ্চাকে পর্যাপ্ত বুকের দুধ খাওয়ানো এবং ডাক্তারের পরামর্শ মেনে চলাই প্রধান কাজ।
জন্ডিস প্রতিরোধের উপায় কি?
জন্ডিস প্রতিরোধের তেমন কোনো উপায় নেই। তবে, জন্মের পর বাচ্চার নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো এবং কোনো লক্ষণ দেখা গেলে দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়াই ভালো।
জন্ডিস হলে কি বাচ্চাকে টিকা দেওয়া যাবে?
এ বিষয়ে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে। জন্ডিসের মাত্রা এবং বাচ্চার শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে ডাক্তার সিদ্ধান্ত নেবেন।
জন্ডিসের ঝুঁকি কখন বাড়ে?
কিছু কিছু ক্ষেত্রে জন্ডিসের ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে। যেমন:
- প্রিম্যাচিউর বাচ্চা (Premature baby): সময়ের আগে জন্ম নেওয়া বাচ্চাদের লিভার পুরোপুরি তৈরি হতে সময় নেয়, তাই তাদের জন্ডিসের ঝুঁকি বেশি থাকে।
- কম ওজনের বাচ্চা: কম ওজন নিয়ে জন্মানো বাচ্চাদেরও জন্ডিসের ঝুঁকি বেশি থাকে।
- বংশগত কারণ: যদি পরিবারের অন্য সদস্যদের আগে জন্ডিস হয়ে থাকে, তাহলে বাচ্চারও জন্ডিস হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
জন্ডিস হলে মায়ের খাদ্য কেমন হওয়া উচিত?
জন্ডিস হলে মায়ের খাবারের দিকে বিশেষ নজর রাখা উচিত। এমন খাবার খাওয়া উচিত যা মায়ের স্বাস্থ্য ভালো রাখে এবং বাচ্চার জন্য বুকের দুধের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় পুষ্টি সরবরাহ করে। নিচে কিছু টিপস দেওয়া হলো:
পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করুন
- গুরুত্ব: বুকের দুধ তৈরি এবং শরীরের অন্যান্য কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখার জন্য প্রচুর পানি পান করা জরুরি।
- কতটুকু: প্রতিদিন অন্তত ৮-১২ গ্লাস পানি পান করুন।
পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করুন
- ফল ও সবজি: প্রচুর ফল ও সবজি খান। এগুলোতে ভিটামিন, মিনারেল এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে যা শরীরকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে।
- প্রোটিন: ডিম, মাছ, মাংস, ডাল এবং বাদাম প্রোটিনের ভালো উৎস। এগুলো শরীরের কোষ তৈরি এবং মেরামতের জন্য জরুরি।
- শস্য: লাল চাল, আটা এবং অন্যান্য শস্যজাতীয় খাবার খান। এগুলো ফাইবার সরবরাহ করে হজমক্ষমতা বাড়ায়।
ভিটামিন ও মিনারেল
- ভিটামিন ডি: কিছু গবেষণায় দেখা গেছে যে ভিটামিন ডি জন্ডিসের চিকিৎসায় সাহায্য করতে পারে। ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ভিটামিন ডি সাপ্লিমেন্ট নিতে পারেন।
- আয়রন: যদি মায়ের শরীরে আয়রনের অভাব থাকে, তবে তা পূরণ করা জরুরি। আয়রন সমৃদ্ধ খাবার যেমন কলিজা, ডিম এবং সবুজ শাকসবজি খেতে পারেন।
যে খাবারগুলো এড়িয়ে যাওয়া উচিত
- অতিরিক্ত চিনি ও ফ্যাট: মিষ্টি ও ভাজা খাবার পরিহার করুন। এগুলো মায়ের ওজন বাড়াতে পারে এবং বাচ্চার জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি সরবরাহ করতে বাধা দিতে পারে।
- অ্যালকোহল ও ক্যাফেইন: অ্যালকোহল এবং ক্যাফেইন বুকের দুধের মাধ্যমে বাচ্চার শরীরে যেতে পারে এবং তার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।
খাবার তালিকা
একটি সাধারণ খাদ্য তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
| খাদ্য গ্রুপ | খাবার | উপকারিতা |
|---|---|---|
| পানি | পানি, ফলের রস, স্যুপ | ডিহাইড্রেশন কমায় এবং বুকের দুধ তৈরি করে |
| ফল | কমলা, মাল্টা, পেঁপে, আম | ভিটামিন ও মিনারেল সরবরাহ করে |
| সবজি | পালং শাক, লাউ, গাজর | অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও ফাইবার সরবরাহ করে |
| প্রোটিন | ডিম, মাছ, মাংস, ডাল | শরীরের কোষ তৈরি ও মেরামত করে |
| শস্য | লাল চাল, আটা, ওটস | ফাইবার সরবরাহ করে হজমক্ষমতা বাড়ায় |
শেষ কথা
নবজাতকের জন্ডিস নিয়ে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। সঠিক সময়ে ডাক্তারের পরামর্শ নিন এবং উপরে দেওয়া টিপসগুলো অনুসরণ করুন। মনে রাখবেন, আপনি একা নন। আপনার পাশে পরিবার, বন্ধু এবং অবশ্যই ডাক্তার আছেন। আপনার একটু সচেতনতা আর যত্নে আপনার সন্তান সুস্থ হয়ে উঠবে, ইনশাআল্লাহ। সুস্থ থাকুন, ভালো থাকুন!
