টিএসএইচ বাড়লে কি হয়

টিএসএইচ বাড়লে কি হয়? জানুন লক্ষণ ও প্রতিকার!

টি এস এইচ (TSH) বাড়লে কি হয়? আপনার জানা দরকার সবকিছু!

থাইরয়েড স্টিমুলেটিং হরমোন, তাই তো? টি এস এইচ (TSH) নামটা শুনে প্রথমে একটু কঠিন লাগলেও, এর গুরুত্ব কিন্তু অনেক। আপনার শরীর ঠিকঠাক চলছে কিনা, সেটা অনেকটাই নির্ভর করে এই হরমোনটির ওপর। তাই টি এস এইচ বাড়লে শরীরে কী কী সমস্যা হতে পারে, সেটা জানা থাকা দরকার। চলুন, সহজ ভাষায় জেনে নেওয়া যাক!

টি এস এইচ (TSH) কী এবং কেন এটা গুরুত্বপূর্ণ?

টি এস এইচ হলো থাইরয়েড গ্রন্থিকে উদ্দীপিত করার হরমোন। আমাদের মস্তিষ্কের পিটুইটারি গ্রন্থি থেকে এই হরমোনটি নিঃসৃত হয়। এর মূল কাজ হলো থাইরয়েড গ্রন্থিকে থাইরক্সিন (T4) এবং ট্রাইআয়োডোথাইরোনিন (T3) হরমোন তৈরি করতে বলা। এই T3 এবং T4 হরমোন আমাদের শরীরের মেটাবলিজম, এনার্জি উৎপাদন এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে।

  • মেটাবলিজম: খাবার হজম করে শক্তি তৈরি করা।
  • এনার্জি: শরীরের কাজকর্মের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি।
  • শারীরিক বৃদ্ধি: শরীরের সঠিক বিকাশ।
  • মানসিক স্বাস্থ্য: মন ভালো রাখা এবং চিন্তা করার ক্ষমতা ঠিক রাখা।

যদি টি এস এইচ বেড়ে যায়, তার মানে থাইরয়েড গ্রন্থি যথেষ্ট পরিমাণে T3 এবং T4 তৈরি করতে পারছে না। তখন পিটুইটারি গ্রন্থি থাইরয়েডকে আরও বেশি করে কাজ করার জন্য সংকেত পাঠায়, যার ফলে টি এস এইচ-এর মাত্রা বেড়ে যায়।

টি এস এইচ বাড়লে কি কি সমস্যা হতে পারে?

টি এস এইচ বাড়লে আপনার শরীরে নানা ধরনের লক্ষণ দেখা দিতে পারে। কারো ক্ষেত্রে হয়তো সামান্য সমস্যা হয়, আবার কারো ক্ষেত্রে এটি মারাত্মক রূপ নিতে পারে। তাই আগে থেকে জানা থাকলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যায়। নিচে কিছু সাধারণ সমস্যা আলোচনা করা হলো:

ক্লান্তি এবং দুর্বলতা

টি এস এইচ বাড়লে শরীর দুর্বল লাগতে পারে এবং অল্প কাজ করলেই ক্লান্তি বোধ হতে পারে। মনে হবে যেন শরীরে এনার্জি নেই।

ওজন বৃদ্ধি

কোনো কারণ ছাড়াই যদি ওজন বাড়তে থাকে, তাহলে টি এস এইচ-এর মাত্রা পরীক্ষা করানো উচিত। থাইরয়েড হরমোন কম উৎপন্ন হওয়ার কারণে মেটাবলিজম কমে যায়, ফলে ওজন বাড়ে।

কোষ্ঠকাঠিন্য

টি এস এইচ বাড়লে হজম প্রক্রিয়া ধীর হয়ে যায়, যার কারণে কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা হতে পারে।

ত্বক এবং চুলের সমস্যা

ত্বক শুষ্ক হয়ে যাওয়া, চুল পড়া এবং নখ ভঙ্গুর হয়ে যাওয়া টি এস এইচ বাড়ার লক্ষণ হতে পারে।

মানসিক সমস্যা

মন খারাপ থাকা, কাজে মনোযোগ দিতে না পারা, স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া এবং বিষণ্ণতাও টি এস এইচ বাড়ার কারণে হতে পারে।

মহিলাদের ক্ষেত্রে মাসিক irregular হওয়া

Google Image

টি এস এইচ বাড়লে মহিলাদের মাসিক irregular হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

অন্যান্য লক্ষণ

  • ঠান্ডা সহ্য করতে না পারা।
  • গলা ফুলে যাওয়া (গলগণ্ড)।
  • পেশিতে ব্যথা।
  • হার্টবিট কমে যাওয়া।

টি এস এইচ কেন বাড়ে? কারণগুলো জেনে নিন

টি এস এইচ বাড়ার পেছনে অনেক কারণ থাকতে পারে। এর মধ্যে কিছু সাধারণ কারণ নিচে উল্লেখ করা হলো:

হাইপোথাইরয়েডিজম

এটি টি এস এইচ বাড়ার প্রধান কারণ। যখন থাইরয়েড গ্রন্থি যথেষ্ট পরিমাণে থাইরয়েড হরমোন তৈরি করতে পারে না, তখন এই সমস্যা হয়।

হাশিমোটোর থাইরয়েডাইটিস

এটি একটি অটোইমিউন রোগ, যেখানে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা থাইরয়েড গ্রন্থির কোষগুলোকে আক্রমণ করে এবং থাইরয়েড হরমোন উৎপাদন কমিয়ে দেয়।

আয়োডিনের অভাব

আয়োডিন থাইরয়েড হরমোন তৈরির জন্য খুব জরুরি। শরীরে আয়োডিনের অভাব হলে থাইরয়েড হরমোন উৎপাদন কমে যায় এবং টি এস এইচ বেড়ে যায়।

কিছু ঔষধ

কিছু ঔষধ, যেমন লিথিয়াম এবং অ্যামিওডারোন, থাইরয়েড হরমোন উৎপাদনে বাধা দিতে পারে এবং টি এস এইচ বাড়াতে পারে।

পিটুইটারি গ্রন্থির টিউমার

যদিও বিরল, পিটুইটারি গ্রন্থিতে টিউমার হলে টি এস এইচ উৎপাদন বেড়ে যেতে পারে।

গর্ভাবস্থা

গর্ভাবস্থায় টি এস এইচ-এর মাত্রা পরিবর্তন হতে পারে। তাই এই সময় নিয়মিত পরীক্ষা করানো উচিত।

টি এস এইচ বাড়লে কি খাবার খাওয়া উচিত?

টি এস এইচ বাড়লে সঠিক খাবার selection করা খুবই জরুরি। কিছু খাবার থাইরয়েড গ্রন্থিকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে, আবার কিছু খাবার থাইরয়েডের কার্যকারিতা কমিয়ে দিতে পারে। নিচে কিছু খাবারের তালিকা দেওয়া হলো:

যা খাওয়া উচিত

  • আয়োডিনযুক্ত খাবার: ডিম, দুধ, দই, সামুদ্রিক মাছ এবং আয়োডিনযুক্ত লবণ থাইরয়েড হরমোন তৈরিতে সাহায্য করে।
  • জিঙ্ক এবং সেলেনিয়াম সমৃদ্ধ খাবার: কুমড়োর বীজ, বাদাম, এবং সূর্যমুখীর বীজ থাইরয়েডের জন্য উপকারী।
  • ফল এবং সবজি: আপেল, কলা, বেরি, পালং শাক এবং অন্যান্য সবুজ শাকসবজি ভিটামিন ও মিনারেল সরবরাহ করে শরীরকে সুস্থ রাখে।

যা এড়িয়ে চলা উচিত

  • গয়ট্রোজেনিক খাবার: বাঁধাকপি, ফুলকপি, ব্রকলি এবং শালগম বেশি পরিমাণে খাওয়া উচিত নয়। এগুলো থাইরয়েড হরমোন উৎপাদনে বাধা দিতে পারে। তবে, রান্না করে খেলে এর প্রভাব কিছুটা কমে যায়।
  • প্রক্রিয়াজাত খাবার: ফাস্ট ফুড, প্যাকেটজাত খাবার এবং চিনি যুক্ত খাবার এড়িয়ে যাওয়া ভালো।
  • গ্লুটেন: কিছু গবেষণায় দেখা গেছে যে গ্লুটেন থাইরয়েড সমস্যা বাড়াতে পারে। তাই গ্লুটেনযুক্ত খাবার কম খাওয়াই ভালো।

টি এস এইচ মাত্রা কমানোর উপায়

টি এস এইচ-এর মাত্রা কমানোর জন্য সাধারণত ঔষধ এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তন প্রয়োজন হয়। নিচে কিছু উপায় আলোচনা করা হলো:

ঔষধ

ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী লিভোথাইরক্সিন (Levothyroxine) নামক ঔষধ সেবন করতে পারেন। এটি থাইরয়েড হরমোনের বিকল্প হিসেবে কাজ করে এবং টি এস এইচ-এর মাত্রা কমাতে সাহায্য করে।

নিয়মিত ব্যায়াম

Google Image

নিয়মিত ব্যায়াম করলে মেটাবলিজম বাড়ে এবং থাইরয়েড হরমোনের কার্যকারিতা উন্নত হয়। প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিটের জন্য হাঁটা, যোগা অথবা অন্য কোনো ব্যায়াম করতে পারেন।

পর্যাপ্ত ঘুম

প্রতিদিন ৭-৮ ঘণ্টা ঘুমানো প্রয়োজন। পর্যাপ্ত ঘুম শরীরকে স্ট্রেস থেকে মুক্তি দেয় এবং হরমোনের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে।

স্ট্রেস কমানো

স্ট্রেস থাইরয়েড হরমোনের ওপর খারাপ প্রভাব ফেলে। তাই স্ট্রেস কমাতে ধ্যান (মেডিটেশন), যোগা এবং শখের কাজ করতে পারেন।

সুষম খাবার

সুষম খাবার গ্রহণ করা থাইরয়েড গ্রন্থির স্বাস্থ্য ভালো রাখার জন্য খুবই জরুরি। ভিটামিন, মিনারেল এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ খাবার খাদ্য তালিকায় যোগ করুন।

নিয়মিত পরীক্ষা

ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত থাইরয়েড পরীক্ষা করানো উচিত। এতে টি এস এইচ-এর মাত্রা নিয়ন্ত্রণে আছে কিনা, তা জানা যায় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা নেওয়া যায়।

গর্ভাবস্থায় টি এস এইচ বাড়লে কি করা উচিত?

গর্ভাবস্থায় টি এস এইচ বাড়লে দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত। গর্ভাবস্থায় থাইরয়েড হরমোনের অভাব হলে মায়ের স্বাস্থ্য এবং শিশুর বিকাশে সমস্যা হতে পারে।

সম্ভাব্য ঝুঁকি

  • গর্ভপাত
  • প্রিম্যাচিউর ডেলিভারি
  • শিশুর মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হওয়া

করণীয়

  • অবিলম্বে ডাক্তারের পরামর্শ নিন।
  • ডাক্তারের দেওয়া ঔষধ নিয়মিত সেবন করুন।
  • নিয়মিত থাইরয়েড পরীক্ষা করান।
  • আয়োডিনযুক্ত খাবার গ্রহণ করুন।

টি এস এইচ নিয়ে কিছু সাধারণ প্রশ্ন (FAQs)

টি এস এইচ (TSH) এর স্বাভাবিক মাত্রা কত?

সাধারণত, টি এস এইচ-এর স্বাভাবিক মাত্রা হলো ০.৪ থেকে ৪.০ mIU/L। তবে, এই মাত্রা ল্যাব এবং ব্যক্তির শারীরিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে কিছুটা কম-বেশি হতে পারে।

টি এস এইচ বেশি থাকলে কি ক্যান্সার হয়?

টি এস এইচ বেশি থাকলে সরাসরি ক্যান্সার হয় না। তবে, থাইরয়েড ক্যান্সার বা অন্য কোনো কারণে থাইরয়েড গ্রন্থি ঠিকমতো কাজ না করলে টি এস এইচ বাড়তে পারে। তাই, টি এস এইচ বেশি থাকলে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

টি এস এইচ কম থাকলে কি সমস্যা হয়?

টি এস এইচ কম থাকলে হাইপারথাইরয়েডিজম হতে পারে, যেখানে থাইরয়েড গ্রন্থি অতিরিক্ত হরমোন তৈরি করে। এর ফলে ওজন কমে যাওয়া, হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া, উদ্বেগ এবং ঘুমের সমস্যা হতে পারে।

মহিলাদের ক্ষেত্রে টি এস এইচ-এর স্বাভাবিক মাত্রা কত হওয়া উচিত?

মহিলাদের ক্ষেত্রে টি এস এইচ-এর স্বাভাবিক মাত্রা সাধারণত ০.৪ থেকে ৪.০ mIU/L এর মধ্যেই থাকে। তবে, গর্ভাবস্থায় এই মাত্রা কিছুটা ভিন্ন হতে পারে এবং ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী তা নিয়ন্ত্রণ করা উচিত।

শিশুদের ক্ষেত্রে টি এস এইচ-এর স্বাভাবিক মাত্রা কত?

শিশুদের ক্ষেত্রে টি এস এইচ-এর স্বাভাবিক মাত্রা বয়সের ওপর নির্ভর করে। নবজাতকদের ক্ষেত্রে এই মাত্রা বেশি থাকে, যা সময়ের সাথে সাথে কমতে থাকে। শিশুদের টি এস এইচ মাত্রা জানার জন্য ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

শেষ কথা

টি এস এইচ বাড়লে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। সঠিক সময়ে ডাক্তারের পরামর্শ নিলে এবং জীবনযাত্রায় কিছু পরিবর্তন আনলে এই সমস্যা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। আপনার শরীরের প্রতি যত্ন নিন, নিয়মিত পরীক্ষা করান এবং সুস্থ থাকুন। মনে রাখবেন, আপনার সুস্বাস্থ্যই আপনার সবচেয়ে বড় সম্পদ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shopping Cart